Friday, 8 July 2016

বেঁচে যাওয়া জিম্মি শোনালেন ৭ জাপানি হত্যার বিবরণ

গুলশান হামলায় জিম্মি জাপানি নাগরিকদের সেদিন হামলা শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যা করা হয়েছিল। রেস্টুরেন্টটিতে চাকরি করা একজন বাংলাদেশি ওইদিন প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন। খুব কাছে থেকে তিনি দেখেছিলেন ৭ জাপানি নাগরিকের মৃত্যু। ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকা ব্যক্তিটি জাপানের গণমাধ্যম দ্য জাপান টাইমস-এ একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেদিনের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন। এখানে সাক্ষাৎকারের অংশটুকু দেয়া হলো-

রেস্টুরেন্টটিতে সেদিন ২০বিদেশি অতিথির মধ্যে ৭জাপানি নাগরিক ছিলেন, যাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে হামলাকারীরা।

সাক্ষাৎকারে ওই বাংলাদেশি জানান, ঘটনার দিন যখন বুঝতে পারলেন রেস্টুরেন্টটিতে হামলাকারীরা প্রবেশ করেছে ওইদিন তিনি প্রাণ বাঁচাতে রেস্টুরেন্টটির শীতল কক্ষে আশ্রয় নেন। তার সাথে একজন জাপানি নাগরিকও প্রাণ বাঁচাতে সেখানে ঢুকেছিলেন, যিনি পরে হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হয়।

ঘটনার বর্ণনাকারী ব্যক্তিটি কাজ করতেন গুলশানে অবস্থিত হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টটির উপরের তলায়। বলেন, সেদিন তিনি পাস্তার উপকরণ আনতে ভেতরে শীতল কক্ষে গেলে হঠাৎ বাইরে থেকে জোরে জোরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে শোনেন, আর সাথে ছিল গুলির শব্দ।

তিনি শীতল কক্ষটির বাইরে তাকালে দেখেন, অতিথিদের বেশ কয়েকজন মাটিতে পড়ে আছে, যাদের কিছুক্ষণ আগেই খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। ওই সময়ই একজন জাপানি নাগরিক তার কাছে ওই শীতল কক্ষে আসতে হাত জোড় করে মিনতি করতে থাকে। তবে ওই কক্ষটি ভেতর থেকে আটকানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ব্যক্তিটি দেখেন হামলাকারীরা হালকা ব্যায়াম করছিল, দেখে মনে হচ্ছিল তারা একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

হামলার পরপরই (রাত সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে দশটা) হামলাকারীরা হঠাৎ সবাই চুপচাপ হয়ে যায়। একজন বলে-‘আর কেউ বাকী আছে কিনা, দেখো।’

প্রথমে একজন ভেতরে প্রবেশ করে আর দুজন রেস্টুরেন্টটির দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের অবস্থান নেয়। 

তারা শীতল কক্ষের ভিতর আশ্রয় নেয়া জাপানি নাগরিকটিকে বের করে নিয়ে যায়।

এ সময় সাক্ষাৎকার প্রদানকারী হামলাকারীদের কাছে প্রাণভিক্ষা চান। সেসসময় দরজার সামনে একজন এসে থামে, পরে ব্যক্তিটি জানতে পেরেছিলেন, ছেলেটি ছিল ২০বছর বয়সী রোহান ইমতিয়াজ, যে একজন বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতার সন্তান। সে বলছিল- ‘চিন্তা করোনা। বেরিয়ে যাও।’

সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি দেখেন, রেস্টুরেন্টটির রক্তাক্ত ডাইনিং-এ সব জাপানি নাগরিকদের একত্রে জড়ো করা হয়েছে। লোকটি জানান, ‘আমি চার থেকে পাঁচজন জাপানি নাগরিককে দেখেছিলাম।’

যখন তিনি দেখার চেষ্টা করেন জাপানের নাগরিকটি কোথায় গেল, দেখলেন, একজন হামলাকারী জাপানের নাগরিকটির দিকে বন্দুক তাক করে আছে, এর কিছুক্ষণ পরই তিনি দুটো গুলির আওয়াজ পান। তবে সামনে দেয়াল থাকায় কিছুই দেখতে পাননি। বলেন, ‘সে তরুণ ছিল, আমরা একটা শীতল কক্ষের ভিতর লুকিয়েছিলাম, আমি তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু এখন আর তার নাম মনে পড়ছে না।’

ওই সময় তিনি রেস্টুরেন্টটির বিভিন্ন টেবিলের নিচে এবং বাইরে ছড়িয়ে থাকা বিদেশিদের লাশ দেখতে পান।

‘এক ভারতীয় মহিলা যে হামলাকারীদের গুলিতে খারাপভাবে আহত ছিল, তাকেও বড় একটা ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়, কোনোপ্রকার দয়া ছাড়া’, জানায় লোকটি।

বলেন, তারা নিজেদের আইএস পরিচয় দিচ্ছিল, জিন্স আর টি-শার্ট পরা ছেলেগুলোকে অনেক শান্ত দেখাচ্ছিল। তারা ইংরেজি আর আরবিতে অনর্গল কথা বলছিল এবং অনবরত তাদের সেলফোনে কথা বলছিল।

২২বছর বয়সী নিবরাস ইসলাম, যাকে তাদের নেতা বলে মনে হচ্ছিল, বলছিল-‘বাংলাদেশীদের চিন্তার কিছু নেই।’ আরও ৭ সন্দেহভাজনের মধ্যে আরেকজন ১৮বছর বয়সী মীর সমিহ মুবাশ্বির, প্রত্যেকের এবং সবার সাথে কুশল বিনিময় করছিল। লোকটির ভাষায়, ‘তার আচরণ অদ্ভুত ছিল।’

পরদিন সকালে বাংলাদেশিদের ছেড়ে দেয়ার পর হামলাকারীদের একজন রোহান ইমতিয়াজ কুরআন থেকে কিছু তিলাওয়াত করে এবং বলে, ‘এখন আমরাও মৃত্যুর জন্য তৈরি।’

ব্যক্তিটি জানান তিনি এরপর কমান্ডোদের দেখেছিলেন যারা অস্ত্রসহ হামলাস্থল আর্টিসানে প্রবেশ করে। যখন তারা দ্বিতীয় তলায় পালানোর চেষ্টা করে, তখনই প্রচন্ড গোলাগুলির আওয়াজ পাওয়া যায়।

এর কিছুক্ষণ পরই হামলার বর্ণনা দেয়া লোকটিকে কর্তৃপক্ষ তাদের হেফাজতে নেয়।

‘নিহত জাপানিদের জন্য আমার গভীর আবেগ ছাড়া আর কিছুই করার ছিলনা, এটা খুবই দুঃখজনক।’-জানায় বেঁচে যাওয়া লোকটি।

No comments:

Post a Comment