Sunday, 9 October 2016

আবারও আশা দেখাচ্ছে বাংলাদেশ

আশা! গত ম্যাচের অভিজ্ঞতা টাটকা আছে বলে ‘আশা’ করতেও যেন ভয়! তবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ কিন্তু দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের জয়ের দিকেই ঝুলে আছে ম্যাচের ভাগ্য। ১২৩ রান তুলতেই ৭ উইকেট পড়ে গেছে ইংল্যান্ডের। এখনো ১১৬ রান দূরত্বে তারা। হাতে মাত্র ৩ উইকেট। বাংলাদেশের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে জস বাটলারও মাত্রই ফিরলেন ৫৭ রান করে।

২৩৯ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ২৬ রানেই ৪ উইকেট হারিয়েছিল ইংল্যান্ড। শুরুটা হলো জেমস ভিন্সকে দিয়ে। চতুর্থ ওভারে মাশরাফি বিন মুর্তজার বলে মোসাদ্দেকের ক্যাচ হয়ে ফিরলেন ইংলিশ ওপেনার। পরের ওভারেই বেন ডাকেটকে ফেরালেন সাকিব আল হাসান। সাকিবের বলটা ঠেকানোর কোনো উপায়ই ছিল না। অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে পিচ করা বল ভেঙে দিল মিডল স্টাম্প। এ বল যে খেলা যায় না!

বেন স্টোকসও চাইলে এ কথাটি বলতে পারেন। মাশরাফির বলে বোল্ড হয়ে শূন্য হাতে ফিরলেন আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান। মাশরাফির আগের ওভারেই ফিরেছেন জেসন রয়। ২৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন ধুঁকছিল ইংল্যান্ড। তারপরই উইকেটে জমে গেলেন বাটলার ও জনি বেয়ারস্টো। ইংল্যান্ডের দুই সংস্করণের দুই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান মিলে পঞ্চম উইকেটে যোগ করলেন ৭৯ রান। মাত্র ৮৩ বলের এই জুটিতেই কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ।

ম্যাচের লাগাম যখন বাংলাদেশের প্রায় হাতছাড়া হওয়ার দশা, ঠিক তখনই আবারও বাংলাদেশের আঘাত। নিজের তৃতীয় ওভারে এসে জায়গামতো প্রথম যে বলটি ফেললেন, তাতেই উইকেট পেলেন তাসকিন। তাঁর গুড লেংথের বলটিতে মুশফিকের ক্যাচ হয়ে ফিরলেন বেয়ারস্টো। ১০৫ রানে ৫ উইকেট হারাল ইংল্যান্ড। ২৭তম ওভারের প্রথম বলে ফিরলেন মঈন আলী। নাসিরের বলে ফিরলেন সাকিবের দুর্দান্ত ক্যাচ হয়ে। পরের ওভারেই বাটলারকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেললেন তাসকিন। আম্পায়ার নাকচ করে দিলেও রিভিউ নিয়ে আউট পেয়ে যায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মাথাব্যথা এখন ক্রিস ওকস। গত বিশ্বকাপেও এই ওকস ভুগিয়েছিলেন বেশ। যদিও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে সেবার জয়বঞ্চিত করতে পারেননি। এবার পারবেন? বাংলাদেশের সমর্থকেরা নিশ্চয়ই তা চান না।

সেই দুর্ধর্ষ মাশরাফির ফিরে আসা


‘নাসির, নাসির’ চিত্কারটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ‘মাশরাফি, মাশরাফি’ স্লোগান দখল করে নিল সে জায়গা। ব্যাট হাতে ৪৪ রানের পর বল হাতেও ইংল্যান্ডের ইনিংসে এখন পর্যন্ত তিনবার আঘাত আনলেন। ম্যাচের ফলাফল এখনই অনুমান করা কঠিন হলেও বাংলাদেশ জিতলে এটা হয়ে যেতে পারে মাশরাফির ম্যাচ। ২৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ড কাঁপছে!

আফগানিস্তান সিরিজের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতেও খেলার সুযোগ হয়নি নাসিরের। তাঁকে দলে নিতে যে রকম ‘গণদাবি’ উঠেছিল, মাঠে নামার পর দর্শকদের তাঁকে স্বাগত জানানোটাই ছিল স্বাভাবিক। নাসির তাতে অনুপ্রাণিত হতে পারেন, অনুভব করে থাকতে পারেন চাপও। কিন্তু মাশরাফির ব্যাটে উড়ে গেল সব চাপ। নাসিরের ওপর থেকে, দুই শর নিচে অলআউটের শঙ্কায় দুলতে থাকা বাংলাদেশের ওপর থেকেও। ইনিংসের শেষ ১০ ওভারে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম প্রকম্পিত হলো ‘মাশরাফি মাশরাফি’ ধ্বনিতে।

মাঝে ব্যাটিংটা মাশরাফি ভুলেই গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছিল। বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই। সর্বশেষ চার ইনিংসে তাঁর রান ৪, ২, ২, ১। অথচ স্লগ ওভারে এই মাশরাফিই কতবার যে বাংলাদেশের ভরসা হয়েছেন! ২০০৭-এ ভারতের বিপক্ষে হোম সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেটার কথা মনে আছে? এই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামেই ২১ বলে করেছিলেন ৪২। শুধু ২১ বলে ৪২-এর জন্য নয়, মাশরাফির সেদিনের ব্যাটিং মনে রাখার আরও কারণ আছে। আউট হওয়ার আগের ওভারে দীনেশ মঙ্গিয়ার বলে মেরেছিলেন পর পর চার ছক্কা। যুবরাজ সিংকে ছক্কা মেরেছিলেন তার আগের ওভারেও।

ওই ম্যাচ বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত না জিতলেও স্লগ ওভারে মাশরাফির ব্যাটে ঝড় উঠেছে, এমন অনেক ম্যাচেই জয় আছে বাংলাদেশের। সেসব ম্যাচের বেশ কয়েকটিতেই মাশরাফির ম্যান অব ম্যাচ হওয়া বলে দিচ্ছে জয়ের পেছনে তাঁর ব্যাটিং–ঝড়ের কতটা ভূমিকা ছিল। সেই মাশরাফি প্রায় দুই বছর কোথায় যে ডুব দিয়ে থাকলেন! ২০১৪ এর নভেম্বরে ঢাকায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৫ বলে ৩৯ করেছিলেন। আজকের আগ পর্যন্ত মাঝের ১৩ ইনিংসে সর্বোচ্চ করেছিলেন ২১।

এর চেয়েও বড় কথা, মাশরাফির ব্যাট থেকে হারিয়ে গিয়েছিল মারকাটারি মেজাজ। এলোমেলো শট, পেস বোলিংয়ের সামনে সন্ত্রস্ত ভাব—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আগের সেই ব্যাটিংটা বুঝি হারিয়েই গেছে তাঁর খেলা থেকে।

বোলিংয়ে সেই ধার নেই, ব্যাট হাতেও এলোমেলো; মাশরাফির নামের সঙ্গেই তো যায় না। অবশেষে ব্যাটে-বলে নিজের দিকে সবটুকু আলো কেড়ে নেওয়া সেই মাশরাফিই যেন ফিরে আসছেন আজ!

১৬৯ রানে ৭ উইকেট পড়ার পর উইকেটে আসেন। ৪৮তম ওভারে যখন আউট হলেন, স্কোরবোর্ডে ২৩১/৯। ২২ বলে ৪২ রানের ইনিংসে দুই বাউন্ডারির সঙ্গে তিন ছক্কা। ওয়ানডেতে মাশরাফির মোট ছক্কা হয়ে গেল ৫২টি। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বেশি ছক্কা আছে কেবল তামিম ইকবাল (৬৪) ও মুশফিকুর রহিমেরই (৫৩)।

এরপর তো বল হাতে টপাটপ উইকেট তুলে নিলেন একে একে। এই তো সেই মাশরাফি!